কুরআন ও হাদিস এর আলোকে হ্জ্জ কাকে বলে ? হজ্জ করার বিধান কি? কার কার উপর হজ আদায় করা ফরজ ?
হজ্জ: কুরআন ও হাদিসের আলোকে
হজ্জ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি, যা মুসলমানদের জন্য একটি বাধ্যতামূলক ধর্মীয় তীর্থযাত্রা।
কুরআনে হজ্জের গুরুত্ব:
- আল-ইমরান সূরার ৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন,
فِيهِ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ مَّقَامُ إِبْرَاهِيمَ ۖ وَمَن دَخَلَهُ كَانَ آمِنًا ۗ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ
- "মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।" (আল-ইমরান ৩:৯৭)
- আল-বাক্বারা সূরার ১২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا ۚ وَاتَّخِذُوا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ۚ وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ يُطَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ
- এবং হজের জন্য ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়াও।" (আল-বাক্বারা ২:১২৫)
হাদিসে হজ্জের গুরুত্ব:
- নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, "ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ হলো: কালিমা শাহাদাহ, নামায, জাকাত, রোজা এবং হজ।" (বুখারী ও মুসলিম)
- আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, "নবী (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, 'কোনটি সর্বোত্তম আমল?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনয়ন করা।' আবার জিজ্ঞেস করা হলো, 'তারপর কোনটি?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।' আবার জিজ্ঞেস করা হলো, 'তারপর কোনটি?' তিনি বললেন, 'হজে মাবরুর বা মকবুল হজ আদায় করা।'" (বুখারী)
হজ্জের বিধান:
হজ্জের বিধান ইসলামের শরিয়তের নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে চলার মাধ্যমে পালন করা হয়।
হজ্জের মূল পর্বগুলি হলো:
- ইহরাম: তীর্থযাত্রীরা ইহরাম নামক পোশাক পরিধান করে হজ্জ শুরু করেন।
- তওয়াফ: কা'বা-র চারদিকে ৭ বার প্রদক্ষিণ করেন।
- সা'ঈ: সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে ৭ বার সাঈ করেন।
- আরাফাতে অবস্থান: আরাফাত নামক সমতলে একদিন অবস্থান করেন।
- মুজদালিফায় অবস্থান : শয়তানকে স্মরণ করে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন।
- হজম: মক্কায় ফিরে মাথা মুন্ডন করেন বা চুল কাটেন।
হজ্জের সময়:
হজ্জ ইসলামি বর্ষপঞ্জির জিলহজ্জ মাসে পালন করা হয়।
কার উপর হজ্জ আদায় করা :
ইসলামের শরিয়ত অনুযায়ী, নিম্নলিখিত শর্তগুলি পূরণকারী ব্যক্তিদের উপর হজ্জ আদায় করা ফরজ:
১. মুসলিম হওয়া:
হজ্জ শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই ফরজ। অমুসলিমদের উপর হজ্জ আদায় করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
২. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া:
হজ্জ আদায়ের জন্য একজন ব্যক্তির অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে। ইসলামী শরিয়তে, একজন ব্যক্তি যখন বয়সের দিক থেকে বালেগ হয়ে যায়, তখন সে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। ছেলেদের জন্য বয়সের সীমা হলো ১৫ বছর এবং মেয়েদের জন্য ১৩ বছর।
৩. সুস্থ হওয়া:
হজ্জ আদায়ের জন্য একজন ব্যক্তির অবশ্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি অসুস্থ থাকে বা হজ্জের কঠিন কাজগুলি করতে অক্ষম হয়, তাহলে তার উপর হজ্জ আদায় করা ফরজ নয়।
৪. আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়া:
হজ্জ আদায়ের জন্য একজন ব্যক্তির অবশ্যই আর্থিকভাবে সক্ষম হতে হবে। এর মানে হলো তার নিজের ও তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট অর্থ থাকতে হবে এবং হজ্জের যাত্রা, থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য খরচ বহন করতে সক্ষম হতে হবে।
৫. নিরাপদে যাত্রা করতে পারা:
হজ্জ আদায়ের জন্য একজন ব্যক্তির অবশ্যই নিরাপদে যাত্রা করতে সক্ষম হতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে নিরাপদে যাত্রা করতে না পারে, তাহলে তার উপর হজ্জ আদায় করা ফরজ নয়।
উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত শর্তগুলি পূরণকারী সকল মহিলাদের উপরও হজ্জ আদায় করা ফরজ। তবে, মহিলাদের হজ্জ আদায়ের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মহিলাদের অবশ্যই একজন মাহরামের সাথে হজ্জে যেতে হবে।
যদি কোন ব্যক্তি উপরোক্ত শর্তগুলি পূরণ করে থাকে, তাহলে তার জীবদ্দশায় অন্তত একবার হজ্জ আদায় করা তার কর্তব্য। হজ্জ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং এটি মুসলমানদের ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং তাদের আত্মাকে পরিশোধিত করে।
হজ্জের মূল উদ্দেশ্য:
- আল্লাহর প্রতি সমর্পণ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা
- সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে সমতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা
- পাপ থেকে মুক্তি ও আধ্যাত্মিক পরিশোধন লাভ করা
লেখক মোহাম্মদ আফ্ফান সাবিত.
ধন্যবাদ
.png)
